জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ৭০টি সরকারি কার্যালয়ে রুফটপ সোলার: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
- M. Zakir Hossain Khan

- Jan 1, 2026
- 3 min read
Updated: 2 days ago
ভূমিকা:
বাংলাদেশ সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই কর্মসূচির ‘উদ্যোগ ক’ বা সরকারি দপ্তর ক্যাটাগরির আওতায় বিদ্যুৎ বিভাগের সুপারিশে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীন ৭০টি বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার স্থাপনের একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২২ কোটি টাকা বাজেটের এই প্রকল্পটি মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের একটি কৌশলগত প্রয়াস। এই প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল, বাস্তবায়নের কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকি হ্রাসের উপায়সমূহ নিচে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
৭০টি সরকারি দপ্তরে রুফটপ সোলার স্থাপন: পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ
নির্বাচিত ৭০টি কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ভিত্তিক এই উদ্যোগটি মূলত জাতীয় গাইডলাইনের উদ্যোগ ‘ক’ (সরকারি দপ্তর)-এর একটি বাস্তব প্রয়োগ। ২২ কোটি টাকা বিনিয়োগের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর চাপ কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুততম সময়ে দেশব্যাপী ২০০০–৩০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি করা।
১. সম্ভাব্য সুবিধা (২২ কোটি টাকা বিনিয়োগের রিটার্ন)
বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় ও বাজেট প্রেডিক্টেবিলিটি: সরকারি দপ্তরগুলো CAPEX (নিজস্ব বিনিয়োগ) মডেলে সোলার স্থাপন করবে। এতে দিনের বেলা গ্রিড বিদ্যুতের ব্যবহার কমবে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রিডে সরবরাহ করে বিলের সাথে সমন্বয় করা যাবে। গাইডলাইন অনুযায়ী মাসভিত্তিক উৎপাদন ও সাশ্রয়ের অডিট ট্র্যাক রাখা বাধ্যতামূলক, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
পিক আওয়ার ম্যানেজমেন্ট ও গ্রিড স্ট্যাবিলিটি: সরকারি অফিসগুলোর কর্মঘণ্টা (সকাল ৯টা-বিকাল ৫টা) সোলার উৎপাদনের সময়ের সাথে হুবহু মিলে যায়। এতে ‘দিনের পিক’ চাহিদা নিরসনে সোলার সরাসরি ভূমিকা রাখবে এবং ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের ওপর চাপ কমবে।
অনলাইন ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া: নেট মিটারিংয়ের আবেদন থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কারিগরি অনুমোদনের জন্য মাত্র ৭ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত (গাইডলাইন পৃষ্ঠা ৭)। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে।
কার্বন ক্রেডিট ও ইমেজ রিটার্ন: এই প্রকল্প থেকে অর্জিত কার্বন ক্রেডিটের হিসাব সংরক্ষণ ও একটি বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে তা ব্যবস্থাপনার অফিশিয়াল ফ্রেমওয়ার্ক রয়েছে (গাইডলাইন পৃষ্ঠা ৯)। এটি জলবায়ু তহবিলের সুবিধা পেতে এবং পরিবেশবান্ধব ইমেজে সহায়তা করবে।
দক্ষ লোকবল ও সক্ষমতা তৈরির ইকোসিস্টেম: এটি কেবল প্যানেল বসানো নয়, বরং দেশব্যাপী একটি কারিগরি ইকোসিস্টেম তৈরির অংশ। এর আওতায় ToT (Training of Trainers), জেলা থেকে মনোনীত কর্মকর্তা এবং ইলেকট্রিশিয়ান প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
দীর্ঘমেয়াদী উপযোগিতা: গড়ে প্রতি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩১-৩২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও, সোলার সিস্টেমের সাধারণ মেয়াদ ২০-২৫ বছর। ফলে ৩-৫ বছরের মধ্যে বিনিয়োগের টাকা উঠে আসার পর দীর্ঘ সময় বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যাবে।
২. প্রধান চ্যালেঞ্জ (ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা)
ছাদের বাস্তব উপযোগিতা ও শেডিং: প্রতিটি দপ্তরের ছাদের সঠিক মাপ, ভবনের স্থায়িত্ব এবং জলাবদ্ধতা রোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং। পাশের উঁচু ভবন বা গাছের ছায়া (Shading) ডিজাইন ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।
সিস্টেম সাইজিং ও লোড ক্যাপ সীমাবদ্ধতা: নেট মিটারিং গাইডলাইন অনুযায়ী, চুক্তিবদ্ধ লোডের বেশি উৎপাদন ক্ষমতা স্থাপন করা যায় না। ফলে কোনো অফিসের ছাদ বিশাল হলেও যদি তাদের ‘অনুমোদিত লোড’ কম হয়, তবে পূর্ণ ছাদ ব্যবহার করা সম্ভব হবে না, যা অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হতে পারে।
প্রকিউরমেন্ট ও কোয়ালিটি রিস্ক: দরপত্র প্রক্রিয়ায় ‘Lowest-bidder’ বা সর্বনিম্ন দরদাতার কারণে নিম্নমানের প্যানেল, ইনভার্টার বা স্ট্রাকচার ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। মান নিয়ন্ত্রণ কঠোর না হলে কয়েক বছরের মধ্যেই আউটপুট আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে।
O&M (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দায়বদ্ধতা: প্রথম ২ বছর EPC ঠিকাদার রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে এবং সার্ভিস চার্জ হিসেবে মোট উৎপাদনের ৫% ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে দিতে হবে (গাইডলাইন পৃষ্ঠা ৯)। সঠিক KPI বা দক্ষ লোকবল না থাকলে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর সিস্টেম অকেজো হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
নিরাপত্তা ও চুরি: জেলা-উপজেলা বাস্তবতায় ছাদে অননুমোদিত প্রবেশ, যন্ত্রাংশ চুরি বা বজ্রপাত সুরক্ষা (Lightning Protection) অবহেলা করলে বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
মনিটরিং ও ডেটা গ্যাপ: স্বচ্ছ বিলিংয়ের জন্য AMR/SCADA সাপোর্টেড মিটারিং এবং অনলাইন মনিটরিং নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ডেটা গ্যাপ থাকলে সাশ্রয় বা ত্রুটি কোনোটিই সঠিক সময়ে ধরা পড়বে না।
সমন্বয় জট: জেলা প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিভাগ, ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বহুমুখী সমন্বয় প্রয়োজন। কাঠামো থাকলেও ‘কেউই একক মালিক না’—এমন মানসিকতা কাজের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
৩. ঝুঁকি কমানোর কৌশল (৭০ অফিসের জন্য সুপারিশ)
১. প্যাকেজিং টেন্ডার: একই জেলার একাধিক অফিসের কাজ একত্রে টেন্ডার করলে ইউনিট কস্ট কমে এবং ভালো মানের ভেন্ডর পাওয়া সহজ হয়।২. পারফরম্যান্স-বেসড গ্রহণ: EPC হ্যান্ডওভারের আগে অন্তত ৩০-৬০ দিনের পারফরম্যান্স ভেরিফিকেশন (PR/ডাউনটাইম চেক) বাধ্যতামূলক করতে হবে।৩. আগেভাগেই লোড-ছাদ ম্যাপিং: ‘রুফটপ সোলার ক্যালকুলেটর’ এবং অনুমোদিত লোডের তথ্য দিয়ে শুরুতেই প্রতিটি সাইটের কারিগরি সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে হবে।
Author: M. Zakir Hossain Khan
Originally published in: Change Initiative
This article is republished for archival and informational purposes. All rights remain with the original publisher.





Comments